মাযহাব কোনটি মানবো এবং কেন?মাযহাব ও তাক্বলীদ ও লা-মাযহাবিয়্যাতের পরিচয়।
মাযহাব কী?
মাযহাব শব্দের অর্থ হল, পথ। যার গন্তব্য হল কুরআন ও সুন্নাহ। আরেক শব্দে বললে, মাযহাব হল, মাধ্যম, যার গন্তব্যের নাম হল, কুরআন ও সুন্নাহ।
আমরা সবাই কুরআন ও সুন্নাহ অনুপাতে আমল করতে চাই। অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত অজুর ফরজ, হাদীসে বর্ণিত অযুর সুন্নত, মুস্তাহাব, অযু ভঙ্গের কারণ, কুরআনও হাদীসে বর্ণিত নামাযের আরকান, ফারায়েজ, নামাযের মাসনূনাত, কতগুলি ওয়াজিব, নামায ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট কারণ কতগুলো? আমাদের দৈনন্দীন জীবনের জীবনঘনিষ্ট মাসায়েলের শরয়ী সমাধান কি? এসব বিষয় আমরা কুরআন ও হাদীসের রীতি অনুপাতে আমল করে আল্লাহকে খুশি করতে চাই।
কিন্তু আমরা গায়রে মুজতাহিদ হবার কারণে, কুরআন খুলে স্পষ্ট শব্দে অজুর ফরজ দেখতে পাই না। হাদীস খুলে নাম্বারসহ গোসলের ফরজ, নামাযের বিবিধ মাসায়েল নাম্বারসহ, নির্দিষ্ট আকারে বের করতে পারি না। তখন আমরা মুজতাহিদ ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বের করা অযুর মাসায়েল, গোসলের মাসায়েল, নামাযের মাসায়েল ইত্যাদি নাম্বারসহ, আলাদা শিরোনাম দিয়ে দিয়ে তারা যা সংকলিত করেছেন, সেই পথনির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা আল্লাহর কুরআন ও তার নবীজী সাঃ এর সুন্নাহের অনুসরণ করি।
তাহলে কী দাঁড়াল? আমরা মানছি কিন্তু কুরআন ও হাদীস। কিন্তু বুঝি না বলে যিনি বুঝেন, তার বের করা মাসায়েলের অনুসরণ করে মূলত কুরআন ও হাদীসেরই অনুসরণ করছি।
এর নামই মাযহাবের অনুসরণ। মুজতাহিদ ইমামগণ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে যে মাসায়েলগুলো বের করে আলাদা শিরোনাম দিয়ে দিয়ে, নাম্বার দিয়ে দিয়ে আলাদা করে লিখে যা সংকলিত করেছেন। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বের করা সেসব মাসআলার সংকলনের নাম হল মাযহাব।
তো মাযহাব অনুসরণ করে আমরা কুরআন ও সুন্নাহই মূলত অনুসরণ করছি। মূলত কোন উম্মতীকে নয়।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিস্কার হতে পারে।
উদাহরণঃ
সূর্য যখন ডুবে যায়। পৃথিবীজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। তখন পৃথিবীর বুকে যে বস্তুগুলো আছে তা আমাদের চোখের পাওয়ার দূর্বল হবার কারণে দেখতে পাই না। তখন আমরা হ্যারিকেন, মোমবাতী, লাইট ইত্যাদি জ্বালিয়ে উক্ত বস্তুগুলোকে দেখি। আলোর ফোকাসে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, তা কিন্তু উক্ত আলোর ফোকাস সৃষ্টি করেনি। বরং আমাদের চোখের পাওয়ারের দুর্বলতার কারণে আগে থেকে থাকা যে বস্তুগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না, তা দেখি মাত্র। মোমবাতীর আলোর ফোকাস কোন কিছু তৈরী করে না, বরং দেখায়।
তেমনি কুরআন ও হাদীসের ভিতরে যে মাসায়েলগুলো নাম্বার আকারে, নির্দিষ্ট আকারে লিপিবদ্ধ করা আছে, তা আমরা কুরআন ও হাদীস খুলে নিজেদের ইলমের দুর্বলতার কারণে দেখতে পাই না। যেমন অজুর ফরজ, গোসলের নির্দিষ্ট ফরজ, সুন্নাত, মাকরূহ ইত্যাদি আলাদা আলাদাভাবে নির্দিষ্ট আকারে আমরা দেখতে পাই না। কারণ আমাদের জ্ঞান কম। ইলম কম। অথচ এ মাসআলাগুলো কুরআন ও হাদীসের ভিতরে আছে। তখন আমরা মুজতাহিদ ইমামদের জ্ঞান, তাদের ইলমের প্রদীপের আলোয় কুরআন ও হাদীসের ভিতরের মাসআলাগুলোকে দেখি।
যে মাসায়েলগুলো মুজতাহিদ ইমামগণ তাদের ইলম ও ফাক্বাহাতের ফোকাস দিয়ে কুরআন ও হাদীসের ভিতর থেকে বের করে উম্মতের জন্য উন্মোচিত করে দিয়েছেন।
মূলত আমরা মানছি কুরআন ও সুন্নাহকে। কিন্তু না বুঝার কারণে সহায়তা নিচ্ছি মুজতাহিদ ইমামগণ থেকে। পরিস্কার বুঝা গেল, মাযহাবের ইমামগণ মাসআলা বানাননি, বরং তারা কুরআন ও হাদীসের ভিতর থেকে মাসআলা দেখিয়েছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে আরো পরিস্কার ধারণা রাখতে হলে আমাদের তিনটি পরিভাষা সম্পর্কে জানতে হবে। শব্দগুলো হলঃ ১-মুজতাহিদ। ২-মুকাল্লিদ। ৩-গায়রে মুকাল্লিদ।
মুজতাহিদ কাকে বলে?
মুজতাহিদ ঐ ব্যক্তিকে বলে, যিনি কুরআন ও সুন্নাহ ঘেটে নিজে নিজে অজু গোসল, নামায, হজ্ব ইত্যাদিসহ মানুষের জীবন ঘনিষ্ট সকল মাসায়েল ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাহ, মুস্তাহাব, মাকরূহ, এসব ভেঙ্গে যাবার কারণ ইত্যাদি আলাদা আলাদা করে বের করে আমল করতে সক্ষম, উক্ত ব্যক্তিকে বলে মুজতাহিদ। অর্থাৎ যিনি নিজে নিজে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে জীবন ঘনিষ্ট যাবতীয় মাসায়েল বের করে আমল করতে পারেন, তাকে বলা হয় মুজতাহিদ। যেমন চার মাযহাবের ইমামগণ ছিলেন মুজতাহিদ।
মুকাল্লিদ কাকে বলে?
মুকাল্লিদ উক্ত ব্যক্তিকে বলে, যিনি নিজে নিজে কুরআন ও সুন্নাহ ঘেটে জীবন ঘনিষ্ট সকল মাসায়েল নির্দিষ্ট আকারে বের করতে পারে না, কিন্তু যিনি পারেন, সেই মুজতাহিদের বের করা মাসায়েল অনুপাতে আমল করে আল্লাহর বিধানের পাবন্দী করেন। উক্ত ব্যক্তিকে বলা হয় মুকাল্লিদ।
যেমন আমরা সবাই হানাফী মাযহাবের মুকাল্লিদ।
গায়রে মুকাল্লিদ কারা?
যারা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নিজ প্রাজ্ঞতায় জীবন ঘনিষ্ঠ সমস্ত মাসায়েল নির্দিষ্ট আকারে বের করতে পারেও না, আবার যারা পারেন, সেই মুজতাহিদের উদ্ভাবিত মাসায়েল অনুসরণও করেন না, বরং নিজে নিজে পন্ডিতী করেন, তাদের বলা হয়, গায়রে মুকাল্লিদ। তাদেরই আরেক নাম (কথিত) আহলে হাদীস।
কয়েকটি উপমার মাধ্যমে বিষয়টি আরো পরিস্কার হবেঃ
সমুদ্রের তলদেশে হীরা মাণিক্য জহরত রয়েছে। যা সবারই প্রয়োজন। কিন্তু সবাই ডুবুরী নয়। ডুবুরী নিজ যোগ্যতায় ডুব দিয়ে সমুদ্রের তলদেশ থেকে হীরা মাণিক্য জহরত আহরণ করে তা ব্যবহার করে।
আর যারা ডুবুরী নয়, তারা উক্ত ডুবুরীর মাধ্যমে উক্ত হীরা মাণিক্য সংগ্রহ করে ব্যবহার করে।
যারা ডুব দিতে জানে না, তারা ডুবুরীর মাধ্যমে হীরা মাণিক্য জহরত পেয়ে ডুবুরীর জন্য দুআ করে। কিন্তু শুকরিয়ায় মাথা নত করে আল্লাহর দরবারে।
আরেক দল ডুবুরী নয়। আবার ডুবুরীর কাছেও যায় না, বরং ডুব না জানা সত্বেও ডুব দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
তেমনি কুরআন ও হাদীসের অভ্যন্তরে মাসায়েলের হীরা মাণিক্য জহরত লুকায়িত। মুজতাহিদ স্বীয় যোগ্যতা বলে সে মাসআলা বের করে আমল করে। আর মুকাল্লিদরা মুজতাহিদের আহরিত মাসায়েলের হীরা মাণিক্য দ্বারা আমল করে।
মুকাল্লিদগণ মুজতাহিদের আহরিত মাসায়েল অনুপাতে আমল করে ইবাদত করে আল্লাহর। আর মাসায়েল সংগ্রাহক মুজতাহিদের জন্য দুআ করে।
আর গায়রে মুকাল্লিদরা মুজতাহিদের কাছে না গিয়ে মাসায়েল বের করার যোগ্যতা না থাকা সত্বেও গবেষণার নামে দ্বীনের মাঝে ফিতনার সৃষ্টি করে।
উপমা নং-২
কোন এলাকায় নতুন নির্মিত মসজিদের সকল মুসল্লির জন্যই অযু করতে পানি প্রয়োজন। কিন্তু সবার পক্ষে জমিন খনন করে পানি বের করে অযু করা সম্ভব নয়।
তখন জমিন খনন করতে সক্ষম কোন দানবীর ব্যক্তি এসে তার মুজাহাদা মেহনত ও শ্রম দিয়ে জমিনের নিচ থেকে মুসল্লিদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে কুপ ইত্যাদি খনন করে দেয়।
খননকৃত কুপের পানি আল্লাহর সৃষ্টি করা। সেই পানি কেবল দানবীর ব্যক্তিটি স্বীয় মুজাহাদা দিয়ে প্রকাশ করে দিয়ে মুসল্লিদের উপর ইহসান করে থাকে। অনেক সময় পানি প্রকাশক উক্ত ব্যক্তির নামে কুপের নামকরণও হয়ে যায়। নামকরণ ব্যক্তির নামে হলেও সবাই জানেন উক্ত পানি জমিনের নিচে জমিনের সৃষ্টি লগ্ন থেকেই ছিল এবং পানির স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা। দানবীর ব্যক্তি কেবল পানির প্রকাশক।
তখন উক্ত মসজিদের মুসল্লিরা কূপের পানি দ্বারা অযু করে মসজিদে প্রবেশ করে ইবাদত করে আল্লাহর। কিন্তু যেহেতু দানবীর ব্যক্তিটি জমিনের নিচ থেকে পানি প্রকাশ করে দিয়ে মুসল্লিদের উপর ইহসান করেছে, তাই মুসল্লিগণ উক্ত পানি দিয়ে অযু করে দানবীর ব্যক্তির জন্য দুআ করে।
তেমনি কুরআন সুন্নাহের গভীরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অযু, গোসল, সালাত ইত্যাদিরর ফরজ, সুন্নত মুস্তাহাব ইত্যাদি কুরআন ও হাদীসের সূচনালগ্ন থেকেই তাতে প্রবিষ্ট করিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সবার পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সেসব মাসায়েল নিজে নিজে বের করে আমল সম্ভব নয়। কিন্তু সবারই অযু করা প্রয়োজন। সবাই নামায পড়া প্রয়োজন।
তখন মুজতাহিদ ইমামগণ তাদের মুজাহাদা মেহনত দিয়ে কুরআন ও হাদীসের ভিতর থেকে মাসায়েলগুলো বের করে, আলাদা আলাদা শিরোনাম দিয়ে দিয়ে, নির্দিষ্ট আকারে লিপিবদ্ধ করে উম্মতের জন্য প্রকাশ করে দিয়েছেন।
তখন মুজতাহিদের অনুসারীরা সেসব মাসায়েল অনুপাতে দ্বীন পালন করে, আর মাসায়েল বের করে দিয়ে ইহসানকারী মুজতাহিদ ইমামদের জন্য দুআ করে। কিন্তু ইবাদত করে আল্লাহর।
উপমা নং-৩
নামাযের ইমামগণ ইমাম হবার কারণে তারা সরাসরি আল্লাহর ইবাদত করে, আর মুসল্লিরা ইমামের অনুসরণে ইবাদত আল্লাহরই করে। কিন্তু বাহ্যিকভাবে অনুসরণ করে ইমামের।
তেমনি মুজতাহিদগণ ইমাম হবার কারণে তারা সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মাসায়েল বের করে আমল করেন, আর মুকাল্লিদগণ মুজতাহিদ ইমামদের অনুসরণে ইবাদত করে আল্লাহর। কিন্তু বাহ্যিকভাবে অনুসরণ করে মুজতাহিদ ইমামের।
উপমা নং-৪
বাংলাদেশের সংবিধানের কোন আইনী জটিলতায় কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হলে, উক্ত ব্যক্তি সংবিধান বিশেষজ্ঞ উকীলের কাছে গমণ করে। আর উক্ত উকীলের পথনির্দেশনায় মুআক্কিল ব্যক্তি বাংলাদেশের সংবিধান মান্য করে।
এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি উকীলের নির্দেশনা মানার কারণে মুআক্কিলকে সংবিধান বিরোধী আখ্যায়িত করে না। করাটা আহমকী ছাড়া আর কী’বা হতে পারে?
তেমনি কুরআন ও সুন্নাহ হল আল্লাহর দেয়া সংবিধান। যারা এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ নয়, তারা উক্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মুজতাহিদ ইমামদের পথনির্দেশনায় আল্লাহর সংবিধান মান্য করে থাকে।
আশা করি মাযহাবের অনুসরণের হাকীকত পরিস্কার হয়ে গেছে। মাযহাব মানা মানে কুরআন ও হাদীসের ভিন্ন কিছু মানা নয়। বরং কুরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির পথনির্দেশনায় কুরআন ও হাদীস মানার নাম হল মাযহাব অনুসরণ। আর কুরআন ও হাদীস না বুঝার পরও নিজের উদ্ভট বুঝ অনুপাতে দ্বীন মানার নামই হল “লা-মাযহাব” বা গায়রে মুকাল্লিদিয়্যাত।
মাযহাব অর্থ ও এর হাকীকত না জানার কারণে আপনার মনে উক্ত প্রশ্নটি উদয় হয়েছে। মাযহাব মানা ছাড়া ইসলামী শরীয়ত মানা বর্তমান সময়ে অসম্ভব।
মাযহাব মানে পথ। যে পথের গন্তব্য হল কুরআন ও সুন্নাহ।তাছাড়া কুরআন ও হাদীসের সবচে’ বিশুদ্ধ ব্যাখ্যার নাম হল মাযহাবের ইমামদের সংকলিত ফিক্বহে ইসলামী। তাই মাযহাব মানা মানেই কুরআন ও হাদীসেরই বিধান মানা।
যারা মুজতাহিদ নয়, তারা মাযহাব অনুসরণ ছাড়া কুরআন ও হাদীসের আলোকে পরিপূর্ণ শরীয়ত মানতেই পারে না। এটি তাদের জন্য অসম্ভব বিষয়।
যেমন অজুর ফরজ কতগুলো? অজু ভঙ্গের কারণ কতগুলো? অজু কতগুলো কারণে মাকরূহ হয়? মুস্তাহাব কতগুলো? অজুর সুন্নাত কতগুলো?
নামাযের শর্ত কতগুলো? নামাযের ফরজ কতগুলো? নামাযের ওয়াজিব কতটি? নামাযের মুস্তাহাব কতগুলো? নামাযের সুন্নত কতগুলো? কতগুলো কারণে নামায মাকরূহ হয়? কতগুলো কারণে নামাযে সাহু সেজদা ওয়াজিব হয়? কতগুলো কারণে নামায ভেঙ্গে যায়? ইত্যাদি বিষয় আলাদা শিরোনাম আকারে, সুনির্দিষ্ট নাম্বারসহ তথা অজু ফরজ চারটি, নামায ভঙ্গের কারণ ১৯টি ইত্যাদি শিরোনাম ও নাম্বারসহ কুরআন ও হাদীসে বিদ্যমান নেই।
তাই একজন সাধারণ মুসলিমের পক্ষে শুধু কুরআন ও হাদীসের অনুবাদ পড়েই এসব বিষয়গুলোর নির্দিষ্ট সংখ্যা বের করে সঠিক পদ্ধদিতে ইবাদত করা সম্ভব নয়।
তাই এমন সাধারণ মুসলিমের কিভাবে দ্বীন পালন করবে?
তাদের জন্য সহজ পথ হল, কুরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ খাইরুল কুরুনের যেসব মুজতাহিদগণ কুরআন ও হাদীস ঘেটে এসব বিষয়গুলো বের করে দিয়েছেন, তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুপাতে ইসলামী শরীয়ত অনুসরণ করা। এর নামই হল মাযহাব অনুসরণ।
আর এমন দ্বীন বিশেষজ্ঞকে অনুসরণের কথা কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য স্থানে নির্দেশ এসেছে। যেমন-
وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ۚ [٣١:١٥]
যে আমার অভিমুখী হয়,তার পথ [মাযহাব] অনুসরণ করবে। [সূরা লুকমান-১৫]
মাযহাব মানে পথ। এ আয়াতে আল্লাহ অভিমুখী তথা কুরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মাযহাব অনুসরণ করার পরিস্কার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।
আরেক আয়াতে এসেছে-
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ [٢١:٧]
অতএব তোমরা যদি না জান তবে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। [সুরা আম্বিয়া-৭]
এ আয়াতেও না জানলে, না বুঝলে, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে জিজ্ঞাসা করে মানতে বলা হয়েছে। আর বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নির্দেশনা অনুপাতে ইসলামী শরীয়ত মানার নামইতো মাযহাব।
এরকম আরো অনেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা জ্ঞানীদের পথ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অনুসরণ করতে বলেছেন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের। আর এভাবে কুরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের অনুসরণে ইসলামী শরীয়ত মান্য করার নামই হল মাযহাব অনুসরণ করা।
মাযহাব ছাড়া দুআ রাকাত নামায পড়াও অসম্ভব
মাযহাব ছাড়া পূর্ণ দ্বীন মানা সম্ভব নয়, তাই চার মাযহাবের যে কোন একটি মাযহাব মানা আবশ্যক।
যেমন দুই রাকাত নামায মাযহাবের অনুসরণ ছাড়া আদায় করা অসম্ভব।
উদাহরণতঃ
১
রুকু করা ফরজ কুরআন দ্বারা প্রমাণিত।
২
রুকুর তাসবীহ পড়া সুন্নত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
৩
রুকুতে গমণের সময় ইমাম জোরে তাকবীর বলে আর মুসল্লি আস্তে তাকবীর বলে। এ মাসআলা কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই। অথচ তা নামাযের মাসআলা। ইমাম যে জোরে তাকবীর বলে, আর মুসল্লি সর্বদা আস্তে আস্তেই তাকবীর বলে এভাবে আমল করার দ্বারা নামায শুদ্ধ হচ্ছে কি না? তা কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই।
এর সমাধান মাযহাবের ইমামদের ইজমা তথা ঐক্যমত্ব এর দ্বারা প্রমানিত হয়েছে।
৪
রুকুতে গিয়ে যদি কেউ ভুল তাকবীর না বলে, রুকুর তাসবীহের বদলে কেউ সেজদার তাসবীহ বলে ফেলল, তাশাহুদের বদলে সূরা ফাতিহা পড়ে ফেললো, জোরে কিরাতের স্থলে আস্তে কিরাত পড়ল, আস্তের স্থলে জোরে পড়ল এসব মাসআলার সমাধান ছাড়াতো সহীহ পদ্ধতিতে নামায পড়া সম্ভব নয়।
আর এসব মাসআলাসহ নামাযের অসংখ্য মাসায়েলের সমাধান না কুরআন দ্বারা প্রমাণিত, না হাদীস দ্বারা প্রমানিত। বরং এসব সমাধান মাযহাবের ইমামগণ কুরআন ও হাদীসের গভীর থেকে মূলনীতি বের করে এর আলোকে উদ্ভাবন করেছেন। আর তাদের উদ্ভাবিত সেসব মাসআলার নামই হল মাযহাব।
এইতো গেল শুধু নামাযের একটি ছোট্ট অংশের উদাহরণ। এমনিভাবে মানুষের জীবনঘনিষ্ট এমন অসংখ্য মাসআলার উপমা পেশ করা যাবে, যার সরাসরি কোন সমাধান কুরআন ও হাদীসে নেই। কিংবা অনেক স্থানেই বাহ্যিক বিরোধপূর্ণ।
তাই মাযহাব মানা ছাড়া সাধারণ মুসলমানদের কোন গত্যান্তর নেই। অন্তত দুই রাকাত ও পূর্ণ করে পড়ার জন্য প্রতিটি মুসলমান মাযহাবের প্রতি মুখাপেক্ষী।
তাই যেহেতু মাযহাব ছাড়া দুই রাকাত নামাযও পড়া যায় না, পূর্ণ দ্বীন মানাতো বহু দূরের কথা, তাই গায়রে মুজতাহিদ ব্যক্তিদের জন্য মাযহাব মানা ওয়াজিব।
আপনার মনে উক্ত প্রশ্নটি আসার মূল কারণ হল, “মাযহাব” শব্দটি আপনি কুরআনে খুঁজে পাচ্ছেন না। তা’ই মনে হচ্ছে উক্ত বিষয়টি কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
কোন শব্দটি কুরআনে না থাকা মানে উক্ত বিষয়টি কুরআন দ্বারা প্রমাণিত নয়, বলা বাচ্চাসূলভ কথা হবে। এমন যুক্তি কোন আকলমন্দ ব্যক্তি দিতেই পারে না। কারণ অনেক বিষয় আছে, আমাদের সমাজে প্রচলিত শব্দ। কিন্তু তার হুবহু শব্দটি কুরআন বা হাদীসে নেই। কিন্তু এর অর্থবোধক বিষয় কুরআন ও হাদীসে আছে।
তো যে বিষয়টির শব্দ না থাকলেও তার অর্থ কুরআন ও হাদীসে থাকার মানেই হল, উক্ত বিষয়টি কুরআন ও হাদীসে আছে। যদিও হুবহু শব্দ না থাকুক।
যেমন, মুসলমানদের কাছে একটি প্রচালিত ও স্বতসিদ্ধ একটি শব্দ হল “তাওহীদ”। যা না থাকলে কোন ব্যক্তি মুসলমানই হতে পারে না। কিন্তু কুরআনের কোথাও “তাওহীদ” শব্দটি নেই। এর মানে কি আপনি বলবেন কুরআন দ্বারা তাওহীদ প্রমাণিত নয়? [নাউজুবিল্লাহ]
হুবহু শব্দ না থাকা মানেই উক্ত বিষয়ের অস্তিত্ব অস্বিকার করা মুর্খতা বৈ কিছু নয়। কুরআনে কারীমে আল্লাহর একাত্ববাদ সম্পর্কিত সকল আয়াতই তাওহীদ বিষয়ক। হুবহু শব্দ না থাকুক।
মাযহাব কোনটি অনুসরণ করবো?
এর উত্তরও আমরা পবিত্র কুরআনে পরিস্কার ভাষায় দেখতে পাই-
ইরশাদ হচ্ছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ [٤:٥٩]
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর,নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং “তোমাদের মধ্যে” যারা জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ তাদের। [সূরা নিসা-৫৯]
উক্ত আয়াতে খেয়াল করুন। আল্লাহ তাআলা ও রাসূল সাঃ এর অনুসরণের নির্দেশের পরেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে “উলিল আমর” তথা বিচারক বা জ্ঞানী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের অনুসরণ করতে।
আল্লাহ ও নবীজী সাঃ এর বিধান বিশেষজ্ঞ জ্ঞানীদের বলা হয় মুজতাহিদ।
এখন প্রশ্ন হল, সারা বিশ্বে অসংখ্য মুজতাহিদ থাকতে পারে। ব্যক্তি কোন মুজতাহিদের অনুসরণ করবে?
আল্লাহ তাআলা এ প্রশ্নের সমাধান জানিয়ে দিয়েছেন আয়াতের “মিনকুম” শব্দ দ্বারা। এর অর্থ হল, তোমাদের মাঝের” তথা তোমাদের মাঝে, তোমাদের সমাজের, তোমাদের এলাকার যিনি মুজতাহিদ হবেন, তোমরা তার অনুসরণ করো। দূরের মুজতাহিদের অনুসরণের কথা বলেননি। অর্থাৎ যার থেকে ফায়দা হাসিল করা সম্ভব নয়, তাদের পিছনে ছুটতে বলা হয়নি। বরং যে মুজতাহিদের ইজতিহাদ পাওয়া যায়, সহজলভ্য, যে মুজতাহিদ নিজেদের এলাকায় থাকেন, সেই মুজতাহিদের অনুসরণ করার কথা পবিত্র কুরআনে পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়ে আমাদের জন্য বিষয়টি সহজ করে দিয়েছেন।
এবার আমরা দেখি এ উপমহাদেশে কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ অনুপাতে ইসলাম আসার পর থেকে ইসলামের যাবতীয় মাসায়েল এসেছে?
নিশ্চয় হানাফী মাযহাবের।
যেদিন থেকে এ উপমহাদেশে ইসলাম নামক জান্নাতী ধর্ম প্রবেশ করেছে, সেদিন ইসলামের সাথে সাথে ইসলামের যেসব বিধানাবলী প্রবেশ করেছে, তা সবই হানাফী মাযহাবের ইমামের ইজতিহাদ অনুপাতে সুবিন্যস্ত কুরআন ও হাদীসের বিধানাবলী।
এ কারণে এ উপমহাদেশের মানুষ মাসায়েল নামায, রোযা, অজু, গোসল ইত্যাদি যাবতীয় মাসায়েলের সুনির্দিষ্ট মাসায়েলগুলো, ওয়াজিব, সুন্নাত, ভঙ্গের কারণ, মাকরূহাত ইত্যাদি সবই হানাফী মাযহাব অনুপাতেই জেনে আমল করে আসছে। এ উপমহাদেশে এ বিষয়ক অসংখ্য গবেষণাগার মাদরাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কুরআন ও হাদীসের সহীহ ব্যাখ্যা নির্ভর এ মাযহাব অনুসারী অসংখ্য শাইখুল হাদীস, মুহাদ্দিস, মুফতী, মুফাককিরে ইসলাম জন্ম নিয়েছেন। তারা আরো সুবিন্যস্তভাবে এ মাসায়েলগুলোকে মানুষর সামনে তুলে ধরেছেন। এখন একজন মানুষ ইচ্ছে করলেই দ্বীনের যেকোন মাসআলা সুনির্দিষ্ট হুকুমসহকারে আলেম উলামাদের কাছ থেকে জেনে আমল করতে পারে।
কিন্তু এ উপমহাদেশের কোথাও শাফেয়ী, হাম্বলী, মালেকী মাযহাবের মাদরাসা দেখা যায় না। দেখা যায় না, এসব মাযহাব বিশেষজ্ঞ শাইখুল হাদীস, মুফতীয়ানে কেরাম। দেখা যায় না ব্যাপক আকারে তাদের কোন কিতাব।
ফলে এ উপমহাদেশে কোন ব্যক্তি অন্য মাযহাব মানতে চাইলে, তার পক্ষে সেই মাযহাব অনুপাতে সকল মাসায়েল জানতে পারা সম্ভব নয়। কারণ না বিশেষজ্ঞ খুঁজে পাবে। না পর্যাপ্ত কিতাব।
এ কারণে সহজ সমাধান হল, যে এলাকায় যে মুজতাহিদের ইজতিহাদ অনুপাতে কুরআন ও হাদীসের মাসায়েল ইসলাম আসার পর থেকে আমলী সূত্রে এসেছে, উক্ত এলাকায় উক্ত মাযহাব অনুপাতেই ইসলামী শরীয়ত পালন করবে। তাহলে আর কোন ফিতনা ও বিভ্রান্তি থাকবে না।
এদিকেই আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়ে সুরা নিসার ৫৯ নাম্বার আয়াতে বলেছেন “মিনকুম” তথা তোমাদের মাঝের বিশেষজ্ঞকে অনুসরণ কর।
তাই উপমহাদেশে হানাফী মাযহাব, শ্রীলংকাতে শাফেয়ী মাযহাব, ও মক্কায় হাম্বলী ও মদীনার লোকেরা মালেকী মাযহাব অনুসরণ করে থাকে। এভাবে যে এলাকায় যে মাযহাবের অনুসারীরা দ্বীন এনেছে ও কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক মাযহাবের আমল জারী হয়েছে, উক্ত এলাকায় সেই মাযহাবই মানবে। তাহলে আর কোন বিভ্রান্তি থাকবে না।
আর প্রশ্নকারী যেহেতু বাংলাদেশের অধিবাসী। তাই তিনি হানাফী মাযহাবের অনুসরণ করবেন। এটাই পবিত্র কুরআনের আয়াতের দাবী।
মাযহাবের ইমামদের লিখিত গ্রন্থাবলী
মাযহাবের ইমামগণ কুরআন ও হাদীসের মাসায়েলগুলো গবেষণা করে যা বের করেছেন, তা পরবর্তীতে তাদের ছাত্ররা কিতাব আকারে সংকলিত করেছেন। যেসবকে ইসলামী ফিক্বহ বলা হয়।
আর হাদীস নবীর হবার পরও সংকলক ইমাম বুখারী মুসলিম হবার কারণে যেমন সংকলনকারীর দিকে নিসবত করে বুখারীর হাদীস, মুসলিমের হাদীস বলা হয়, তেমনি ফিক্বহে ইসলামী সংকলকদের নামেও উক্ত ফিক্বহগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। যেমন হানাফী ফিক্বহ, শাফেয়ী ফিক্বহ, হাম্বলী ফিক্বহ, মালেকী ফিক্বহ। যা ইসলামী লাইব্রেরীগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলেই আপনার দৃষ্টিগোচর হবে।
মক্কা মদীনার বড় লাইব্রেরীগুলোর দিকে তাকালেই আপনার চোখে মাযহাবের ইমামদের সংকলিত ফিক্বহে ইসলামীর অসংখ্য কিতাব নজরে আসবে।
অন্ধ অনুসরণ!
প্রথমে অন্ধ অনুসরণের অর্থ বুঝে নিন।
অন্ধ ব্যক্তি আরেক অন্ধের পিছনে পিছনে চলার নাম হল অন্ধ অনুসরণ। কিন্তু অন্ধ কোন চক্ষুষমানের পিছু পিছু, তার হাত ধরে চলার নাম কিন্তু অন্ধ অনুসরণ নয়। একে বলা হবে চক্ষুষমানের অনুসরণ।
আপনি যদি বলেন, মুজতাহিদ তথা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির অনুসরণ করে দ্বীন মানাও অন্ধ অনুসরণ। তাহলে বলবোঃ
আপনি মুজতাহিদ না হলে, মুখে যতই বলেন, কারো অনুসরণ করবেন না, কিন্তু আপনি কারো না কারো অন্ধ অনুসরণ না করে দ্বীন মানতেই পারবেন না।
সহীহ, জঈফ, মুনকার, মুদাল্লাস, হাসান ইত্যাদি পরিভাষা আপনি মুহাদ্দিসদের অন্ধ অনুসরণ ছাড়া ব্যবহার করতে পারবেন না। কারণ এসব পরিভাষা কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই।
কোন রাবীকে সহীহ বলা, বা জঈফ বলা, হাদীসকে সহীহ বা জঈফ বলা, ইত্যাদি আপনি মুহাদ্দিসদের মন্তব্যের অন্ধ অনুসরণ ছাড়া বলতেই পারবেন না।
দেখা যাবে এক মুহাদ্দিস তার জন্ম নেবার চারশত বছর আগের রাবীর ক্ষেত্রে মন্তব্য করছেন। যা বুঝা যায়, তিনি উক্ত রাবীকে দেখার প্রশ্নই আসে না। তবু আপনার উক্ত মুহাদ্দিসের কথাই মানতে হয় অন্ধভাবে।
যেমন ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী অষ্টম শতাব্দীর লোক। কিন্তু তিনি দ্বিতীয় তৃতীয় শতকের রাবীদের ব্যাপারেও জরাহ করেছেন। তার এসব জরাহ আপনি কিসের ভিত্তিতে মানবেন? নিশ্চয় আপনাকে এ বিষয়ে অন্ধ তাকলীদই করতে হবে।
সুতরাং কারো অন্ধ অনুসরণ করবেন না এটি খুবই চটকদার কথা হলেও বাস্তবে অন্তসারশূণ্য একটি কথা।
তাই এসব পন্ডিতী করে শুধু আপনি সময় বরবাদ করবেন। নিজের মনে পেরেশানী তৈরী করবেন। দ্বীনী মাসায়েল বিষয়ে সন্দেহ হতে হতে [আল্লাহ না করুন] এক সময় পুরো দ্বীনের উপরই আপনার সন্দেহ তৈরীর মত ভয়াবহ অবস্থাও তৈরী হয়ে যেতে পারে।তাই নিজের অজ্ঞতা সত্বেও কুরআন ও হাদীসের বিধানাবলী বিশেষজ্ঞ সাজার এ ভয়াবহ খেল বন্ধ করুন।
বাংলাদেশে প্রচলিত কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক সংকলিত হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে মনের প্রশান্তির সাথে ইবাদত করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সহীহ দ্বীনের উপর চলার তৌফিক দান করুন।
মাযহাব শব্দের অর্থ হল, পথ। যার গন্তব্য হল কুরআন ও সুন্নাহ। আরেক শব্দে বললে, মাযহাব হল, মাধ্যম, যার গন্তব্যের নাম হল, কুরআন ও সুন্নাহ।
আমরা সবাই কুরআন ও সুন্নাহ অনুপাতে আমল করতে চাই। অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত অজুর ফরজ, হাদীসে বর্ণিত অযুর সুন্নত, মুস্তাহাব, অযু ভঙ্গের কারণ, কুরআনও হাদীসে বর্ণিত নামাযের আরকান, ফারায়েজ, নামাযের মাসনূনাত, কতগুলি ওয়াজিব, নামায ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট কারণ কতগুলো? আমাদের দৈনন্দীন জীবনের জীবনঘনিষ্ট মাসায়েলের শরয়ী সমাধান কি? এসব বিষয় আমরা কুরআন ও হাদীসের রীতি অনুপাতে আমল করে আল্লাহকে খুশি করতে চাই।
কিন্তু আমরা গায়রে মুজতাহিদ হবার কারণে, কুরআন খুলে স্পষ্ট শব্দে অজুর ফরজ দেখতে পাই না। হাদীস খুলে নাম্বারসহ গোসলের ফরজ, নামাযের বিবিধ মাসায়েল নাম্বারসহ, নির্দিষ্ট আকারে বের করতে পারি না। তখন আমরা মুজতাহিদ ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বের করা অযুর মাসায়েল, গোসলের মাসায়েল, নামাযের মাসায়েল ইত্যাদি নাম্বারসহ, আলাদা শিরোনাম দিয়ে দিয়ে তারা যা সংকলিত করেছেন, সেই পথনির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা আল্লাহর কুরআন ও তার নবীজী সাঃ এর সুন্নাহের অনুসরণ করি।
তাহলে কী দাঁড়াল? আমরা মানছি কিন্তু কুরআন ও হাদীস। কিন্তু বুঝি না বলে যিনি বুঝেন, তার বের করা মাসায়েলের অনুসরণ করে মূলত কুরআন ও হাদীসেরই অনুসরণ করছি।
এর নামই মাযহাবের অনুসরণ। মুজতাহিদ ইমামগণ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে যে মাসায়েলগুলো বের করে আলাদা শিরোনাম দিয়ে দিয়ে, নাম্বার দিয়ে দিয়ে আলাদা করে লিখে যা সংকলিত করেছেন। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বের করা সেসব মাসআলার সংকলনের নাম হল মাযহাব।
তো মাযহাব অনুসরণ করে আমরা কুরআন ও সুন্নাহই মূলত অনুসরণ করছি। মূলত কোন উম্মতীকে নয়।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিস্কার হতে পারে।
উদাহরণঃ
সূর্য যখন ডুবে যায়। পৃথিবীজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। তখন পৃথিবীর বুকে যে বস্তুগুলো আছে তা আমাদের চোখের পাওয়ার দূর্বল হবার কারণে দেখতে পাই না। তখন আমরা হ্যারিকেন, মোমবাতী, লাইট ইত্যাদি জ্বালিয়ে উক্ত বস্তুগুলোকে দেখি। আলোর ফোকাসে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, তা কিন্তু উক্ত আলোর ফোকাস সৃষ্টি করেনি। বরং আমাদের চোখের পাওয়ারের দুর্বলতার কারণে আগে থেকে থাকা যে বস্তুগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না, তা দেখি মাত্র। মোমবাতীর আলোর ফোকাস কোন কিছু তৈরী করে না, বরং দেখায়।
তেমনি কুরআন ও হাদীসের ভিতরে যে মাসায়েলগুলো নাম্বার আকারে, নির্দিষ্ট আকারে লিপিবদ্ধ করা আছে, তা আমরা কুরআন ও হাদীস খুলে নিজেদের ইলমের দুর্বলতার কারণে দেখতে পাই না। যেমন অজুর ফরজ, গোসলের নির্দিষ্ট ফরজ, সুন্নাত, মাকরূহ ইত্যাদি আলাদা আলাদাভাবে নির্দিষ্ট আকারে আমরা দেখতে পাই না। কারণ আমাদের জ্ঞান কম। ইলম কম। অথচ এ মাসআলাগুলো কুরআন ও হাদীসের ভিতরে আছে। তখন আমরা মুজতাহিদ ইমামদের জ্ঞান, তাদের ইলমের প্রদীপের আলোয় কুরআন ও হাদীসের ভিতরের মাসআলাগুলোকে দেখি।
যে মাসায়েলগুলো মুজতাহিদ ইমামগণ তাদের ইলম ও ফাক্বাহাতের ফোকাস দিয়ে কুরআন ও হাদীসের ভিতর থেকে বের করে উম্মতের জন্য উন্মোচিত করে দিয়েছেন।
মূলত আমরা মানছি কুরআন ও সুন্নাহকে। কিন্তু না বুঝার কারণে সহায়তা নিচ্ছি মুজতাহিদ ইমামগণ থেকে। পরিস্কার বুঝা গেল, মাযহাবের ইমামগণ মাসআলা বানাননি, বরং তারা কুরআন ও হাদীসের ভিতর থেকে মাসআলা দেখিয়েছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে আরো পরিস্কার ধারণা রাখতে হলে আমাদের তিনটি পরিভাষা সম্পর্কে জানতে হবে। শব্দগুলো হলঃ ১-মুজতাহিদ। ২-মুকাল্লিদ। ৩-গায়রে মুকাল্লিদ।
মুজতাহিদ কাকে বলে?
মুজতাহিদ ঐ ব্যক্তিকে বলে, যিনি কুরআন ও সুন্নাহ ঘেটে নিজে নিজে অজু গোসল, নামায, হজ্ব ইত্যাদিসহ মানুষের জীবন ঘনিষ্ট সকল মাসায়েল ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাহ, মুস্তাহাব, মাকরূহ, এসব ভেঙ্গে যাবার কারণ ইত্যাদি আলাদা আলাদা করে বের করে আমল করতে সক্ষম, উক্ত ব্যক্তিকে বলে মুজতাহিদ। অর্থাৎ যিনি নিজে নিজে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে জীবন ঘনিষ্ট যাবতীয় মাসায়েল বের করে আমল করতে পারেন, তাকে বলা হয় মুজতাহিদ। যেমন চার মাযহাবের ইমামগণ ছিলেন মুজতাহিদ।
মুকাল্লিদ কাকে বলে?
মুকাল্লিদ উক্ত ব্যক্তিকে বলে, যিনি নিজে নিজে কুরআন ও সুন্নাহ ঘেটে জীবন ঘনিষ্ট সকল মাসায়েল নির্দিষ্ট আকারে বের করতে পারে না, কিন্তু যিনি পারেন, সেই মুজতাহিদের বের করা মাসায়েল অনুপাতে আমল করে আল্লাহর বিধানের পাবন্দী করেন। উক্ত ব্যক্তিকে বলা হয় মুকাল্লিদ।
যেমন আমরা সবাই হানাফী মাযহাবের মুকাল্লিদ।
গায়রে মুকাল্লিদ কারা?
যারা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নিজ প্রাজ্ঞতায় জীবন ঘনিষ্ঠ সমস্ত মাসায়েল নির্দিষ্ট আকারে বের করতে পারেও না, আবার যারা পারেন, সেই মুজতাহিদের উদ্ভাবিত মাসায়েল অনুসরণও করেন না, বরং নিজে নিজে পন্ডিতী করেন, তাদের বলা হয়, গায়রে মুকাল্লিদ। তাদেরই আরেক নাম (কথিত) আহলে হাদীস।
কয়েকটি উপমার মাধ্যমে বিষয়টি আরো পরিস্কার হবেঃ
সমুদ্রের তলদেশে হীরা মাণিক্য জহরত রয়েছে। যা সবারই প্রয়োজন। কিন্তু সবাই ডুবুরী নয়। ডুবুরী নিজ যোগ্যতায় ডুব দিয়ে সমুদ্রের তলদেশ থেকে হীরা মাণিক্য জহরত আহরণ করে তা ব্যবহার করে।
আর যারা ডুবুরী নয়, তারা উক্ত ডুবুরীর মাধ্যমে উক্ত হীরা মাণিক্য সংগ্রহ করে ব্যবহার করে।
যারা ডুব দিতে জানে না, তারা ডুবুরীর মাধ্যমে হীরা মাণিক্য জহরত পেয়ে ডুবুরীর জন্য দুআ করে। কিন্তু শুকরিয়ায় মাথা নত করে আল্লাহর দরবারে।
আরেক দল ডুবুরী নয়। আবার ডুবুরীর কাছেও যায় না, বরং ডুব না জানা সত্বেও ডুব দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
তেমনি কুরআন ও হাদীসের অভ্যন্তরে মাসায়েলের হীরা মাণিক্য জহরত লুকায়িত। মুজতাহিদ স্বীয় যোগ্যতা বলে সে মাসআলা বের করে আমল করে। আর মুকাল্লিদরা মুজতাহিদের আহরিত মাসায়েলের হীরা মাণিক্য দ্বারা আমল করে।
মুকাল্লিদগণ মুজতাহিদের আহরিত মাসায়েল অনুপাতে আমল করে ইবাদত করে আল্লাহর। আর মাসায়েল সংগ্রাহক মুজতাহিদের জন্য দুআ করে।
আর গায়রে মুকাল্লিদরা মুজতাহিদের কাছে না গিয়ে মাসায়েল বের করার যোগ্যতা না থাকা সত্বেও গবেষণার নামে দ্বীনের মাঝে ফিতনার সৃষ্টি করে।
উপমা নং-২
কোন এলাকায় নতুন নির্মিত মসজিদের সকল মুসল্লির জন্যই অযু করতে পানি প্রয়োজন। কিন্তু সবার পক্ষে জমিন খনন করে পানি বের করে অযু করা সম্ভব নয়।
তখন জমিন খনন করতে সক্ষম কোন দানবীর ব্যক্তি এসে তার মুজাহাদা মেহনত ও শ্রম দিয়ে জমিনের নিচ থেকে মুসল্লিদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে কুপ ইত্যাদি খনন করে দেয়।
খননকৃত কুপের পানি আল্লাহর সৃষ্টি করা। সেই পানি কেবল দানবীর ব্যক্তিটি স্বীয় মুজাহাদা দিয়ে প্রকাশ করে দিয়ে মুসল্লিদের উপর ইহসান করে থাকে। অনেক সময় পানি প্রকাশক উক্ত ব্যক্তির নামে কুপের নামকরণও হয়ে যায়। নামকরণ ব্যক্তির নামে হলেও সবাই জানেন উক্ত পানি জমিনের নিচে জমিনের সৃষ্টি লগ্ন থেকেই ছিল এবং পানির স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা। দানবীর ব্যক্তি কেবল পানির প্রকাশক।
তখন উক্ত মসজিদের মুসল্লিরা কূপের পানি দ্বারা অযু করে মসজিদে প্রবেশ করে ইবাদত করে আল্লাহর। কিন্তু যেহেতু দানবীর ব্যক্তিটি জমিনের নিচ থেকে পানি প্রকাশ করে দিয়ে মুসল্লিদের উপর ইহসান করেছে, তাই মুসল্লিগণ উক্ত পানি দিয়ে অযু করে দানবীর ব্যক্তির জন্য দুআ করে।
তেমনি কুরআন সুন্নাহের গভীরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অযু, গোসল, সালাত ইত্যাদিরর ফরজ, সুন্নত মুস্তাহাব ইত্যাদি কুরআন ও হাদীসের সূচনালগ্ন থেকেই তাতে প্রবিষ্ট করিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সবার পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সেসব মাসায়েল নিজে নিজে বের করে আমল সম্ভব নয়। কিন্তু সবারই অযু করা প্রয়োজন। সবাই নামায পড়া প্রয়োজন।
তখন মুজতাহিদ ইমামগণ তাদের মুজাহাদা মেহনত দিয়ে কুরআন ও হাদীসের ভিতর থেকে মাসায়েলগুলো বের করে, আলাদা আলাদা শিরোনাম দিয়ে দিয়ে, নির্দিষ্ট আকারে লিপিবদ্ধ করে উম্মতের জন্য প্রকাশ করে দিয়েছেন।
তখন মুজতাহিদের অনুসারীরা সেসব মাসায়েল অনুপাতে দ্বীন পালন করে, আর মাসায়েল বের করে দিয়ে ইহসানকারী মুজতাহিদ ইমামদের জন্য দুআ করে। কিন্তু ইবাদত করে আল্লাহর।
উপমা নং-৩
নামাযের ইমামগণ ইমাম হবার কারণে তারা সরাসরি আল্লাহর ইবাদত করে, আর মুসল্লিরা ইমামের অনুসরণে ইবাদত আল্লাহরই করে। কিন্তু বাহ্যিকভাবে অনুসরণ করে ইমামের।
তেমনি মুজতাহিদগণ ইমাম হবার কারণে তারা সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মাসায়েল বের করে আমল করেন, আর মুকাল্লিদগণ মুজতাহিদ ইমামদের অনুসরণে ইবাদত করে আল্লাহর। কিন্তু বাহ্যিকভাবে অনুসরণ করে মুজতাহিদ ইমামের।
উপমা নং-৪
বাংলাদেশের সংবিধানের কোন আইনী জটিলতায় কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হলে, উক্ত ব্যক্তি সংবিধান বিশেষজ্ঞ উকীলের কাছে গমণ করে। আর উক্ত উকীলের পথনির্দেশনায় মুআক্কিল ব্যক্তি বাংলাদেশের সংবিধান মান্য করে।
এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি উকীলের নির্দেশনা মানার কারণে মুআক্কিলকে সংবিধান বিরোধী আখ্যায়িত করে না। করাটা আহমকী ছাড়া আর কী’বা হতে পারে?
তেমনি কুরআন ও সুন্নাহ হল আল্লাহর দেয়া সংবিধান। যারা এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ নয়, তারা উক্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মুজতাহিদ ইমামদের পথনির্দেশনায় আল্লাহর সংবিধান মান্য করে থাকে।
আশা করি মাযহাবের অনুসরণের হাকীকত পরিস্কার হয়ে গেছে। মাযহাব মানা মানে কুরআন ও হাদীসের ভিন্ন কিছু মানা নয়। বরং কুরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির পথনির্দেশনায় কুরআন ও হাদীস মানার নাম হল মাযহাব অনুসরণ। আর কুরআন ও হাদীস না বুঝার পরও নিজের উদ্ভট বুঝ অনুপাতে দ্বীন মানার নামই হল “লা-মাযহাব” বা গায়রে মুকাল্লিদিয়্যাত।
মাযহাব অর্থ ও এর হাকীকত না জানার কারণে আপনার মনে উক্ত প্রশ্নটি উদয় হয়েছে। মাযহাব মানা ছাড়া ইসলামী শরীয়ত মানা বর্তমান সময়ে অসম্ভব।
মাযহাব মানে পথ। যে পথের গন্তব্য হল কুরআন ও সুন্নাহ।তাছাড়া কুরআন ও হাদীসের সবচে’ বিশুদ্ধ ব্যাখ্যার নাম হল মাযহাবের ইমামদের সংকলিত ফিক্বহে ইসলামী। তাই মাযহাব মানা মানেই কুরআন ও হাদীসেরই বিধান মানা।
যারা মুজতাহিদ নয়, তারা মাযহাব অনুসরণ ছাড়া কুরআন ও হাদীসের আলোকে পরিপূর্ণ শরীয়ত মানতেই পারে না। এটি তাদের জন্য অসম্ভব বিষয়।
যেমন অজুর ফরজ কতগুলো? অজু ভঙ্গের কারণ কতগুলো? অজু কতগুলো কারণে মাকরূহ হয়? মুস্তাহাব কতগুলো? অজুর সুন্নাত কতগুলো?
নামাযের শর্ত কতগুলো? নামাযের ফরজ কতগুলো? নামাযের ওয়াজিব কতটি? নামাযের মুস্তাহাব কতগুলো? নামাযের সুন্নত কতগুলো? কতগুলো কারণে নামায মাকরূহ হয়? কতগুলো কারণে নামাযে সাহু সেজদা ওয়াজিব হয়? কতগুলো কারণে নামায ভেঙ্গে যায়? ইত্যাদি বিষয় আলাদা শিরোনাম আকারে, সুনির্দিষ্ট নাম্বারসহ তথা অজু ফরজ চারটি, নামায ভঙ্গের কারণ ১৯টি ইত্যাদি শিরোনাম ও নাম্বারসহ কুরআন ও হাদীসে বিদ্যমান নেই।
তাই একজন সাধারণ মুসলিমের পক্ষে শুধু কুরআন ও হাদীসের অনুবাদ পড়েই এসব বিষয়গুলোর নির্দিষ্ট সংখ্যা বের করে সঠিক পদ্ধদিতে ইবাদত করা সম্ভব নয়।
তাই এমন সাধারণ মুসলিমের কিভাবে দ্বীন পালন করবে?
তাদের জন্য সহজ পথ হল, কুরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ খাইরুল কুরুনের যেসব মুজতাহিদগণ কুরআন ও হাদীস ঘেটে এসব বিষয়গুলো বের করে দিয়েছেন, তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুপাতে ইসলামী শরীয়ত অনুসরণ করা। এর নামই হল মাযহাব অনুসরণ।
আর এমন দ্বীন বিশেষজ্ঞকে অনুসরণের কথা কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য স্থানে নির্দেশ এসেছে। যেমন-
وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ۚ [٣١:١٥]
যে আমার অভিমুখী হয়,তার পথ [মাযহাব] অনুসরণ করবে। [সূরা লুকমান-১৫]
মাযহাব মানে পথ। এ আয়াতে আল্লাহ অভিমুখী তথা কুরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মাযহাব অনুসরণ করার পরিস্কার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।
আরেক আয়াতে এসেছে-
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ [٢١:٧]
অতএব তোমরা যদি না জান তবে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। [সুরা আম্বিয়া-৭]
এ আয়াতেও না জানলে, না বুঝলে, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে জিজ্ঞাসা করে মানতে বলা হয়েছে। আর বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নির্দেশনা অনুপাতে ইসলামী শরীয়ত মানার নামইতো মাযহাব।
এরকম আরো অনেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা জ্ঞানীদের পথ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অনুসরণ করতে বলেছেন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের। আর এভাবে কুরআন ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের অনুসরণে ইসলামী শরীয়ত মান্য করার নামই হল মাযহাব অনুসরণ করা।
মাযহাব ছাড়া দুআ রাকাত নামায পড়াও অসম্ভব
মাযহাব ছাড়া পূর্ণ দ্বীন মানা সম্ভব নয়, তাই চার মাযহাবের যে কোন একটি মাযহাব মানা আবশ্যক।
যেমন দুই রাকাত নামায মাযহাবের অনুসরণ ছাড়া আদায় করা অসম্ভব।
উদাহরণতঃ
১
রুকু করা ফরজ কুরআন দ্বারা প্রমাণিত।
২
রুকুর তাসবীহ পড়া সুন্নত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
৩
রুকুতে গমণের সময় ইমাম জোরে তাকবীর বলে আর মুসল্লি আস্তে তাকবীর বলে। এ মাসআলা কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই। অথচ তা নামাযের মাসআলা। ইমাম যে জোরে তাকবীর বলে, আর মুসল্লি সর্বদা আস্তে আস্তেই তাকবীর বলে এভাবে আমল করার দ্বারা নামায শুদ্ধ হচ্ছে কি না? তা কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই।
এর সমাধান মাযহাবের ইমামদের ইজমা তথা ঐক্যমত্ব এর দ্বারা প্রমানিত হয়েছে।
৪
রুকুতে গিয়ে যদি কেউ ভুল তাকবীর না বলে, রুকুর তাসবীহের বদলে কেউ সেজদার তাসবীহ বলে ফেলল, তাশাহুদের বদলে সূরা ফাতিহা পড়ে ফেললো, জোরে কিরাতের স্থলে আস্তে কিরাত পড়ল, আস্তের স্থলে জোরে পড়ল এসব মাসআলার সমাধান ছাড়াতো সহীহ পদ্ধতিতে নামায পড়া সম্ভব নয়।
আর এসব মাসআলাসহ নামাযের অসংখ্য মাসায়েলের সমাধান না কুরআন দ্বারা প্রমাণিত, না হাদীস দ্বারা প্রমানিত। বরং এসব সমাধান মাযহাবের ইমামগণ কুরআন ও হাদীসের গভীর থেকে মূলনীতি বের করে এর আলোকে উদ্ভাবন করেছেন। আর তাদের উদ্ভাবিত সেসব মাসআলার নামই হল মাযহাব।
এইতো গেল শুধু নামাযের একটি ছোট্ট অংশের উদাহরণ। এমনিভাবে মানুষের জীবনঘনিষ্ট এমন অসংখ্য মাসআলার উপমা পেশ করা যাবে, যার সরাসরি কোন সমাধান কুরআন ও হাদীসে নেই। কিংবা অনেক স্থানেই বাহ্যিক বিরোধপূর্ণ।
তাই মাযহাব মানা ছাড়া সাধারণ মুসলমানদের কোন গত্যান্তর নেই। অন্তত দুই রাকাত ও পূর্ণ করে পড়ার জন্য প্রতিটি মুসলমান মাযহাবের প্রতি মুখাপেক্ষী।
তাই যেহেতু মাযহাব ছাড়া দুই রাকাত নামাযও পড়া যায় না, পূর্ণ দ্বীন মানাতো বহু দূরের কথা, তাই গায়রে মুজতাহিদ ব্যক্তিদের জন্য মাযহাব মানা ওয়াজিব।
আপনার মনে উক্ত প্রশ্নটি আসার মূল কারণ হল, “মাযহাব” শব্দটি আপনি কুরআনে খুঁজে পাচ্ছেন না। তা’ই মনে হচ্ছে উক্ত বিষয়টি কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
কোন শব্দটি কুরআনে না থাকা মানে উক্ত বিষয়টি কুরআন দ্বারা প্রমাণিত নয়, বলা বাচ্চাসূলভ কথা হবে। এমন যুক্তি কোন আকলমন্দ ব্যক্তি দিতেই পারে না। কারণ অনেক বিষয় আছে, আমাদের সমাজে প্রচলিত শব্দ। কিন্তু তার হুবহু শব্দটি কুরআন বা হাদীসে নেই। কিন্তু এর অর্থবোধক বিষয় কুরআন ও হাদীসে আছে।
তো যে বিষয়টির শব্দ না থাকলেও তার অর্থ কুরআন ও হাদীসে থাকার মানেই হল, উক্ত বিষয়টি কুরআন ও হাদীসে আছে। যদিও হুবহু শব্দ না থাকুক।
যেমন, মুসলমানদের কাছে একটি প্রচালিত ও স্বতসিদ্ধ একটি শব্দ হল “তাওহীদ”। যা না থাকলে কোন ব্যক্তি মুসলমানই হতে পারে না। কিন্তু কুরআনের কোথাও “তাওহীদ” শব্দটি নেই। এর মানে কি আপনি বলবেন কুরআন দ্বারা তাওহীদ প্রমাণিত নয়? [নাউজুবিল্লাহ]
হুবহু শব্দ না থাকা মানেই উক্ত বিষয়ের অস্তিত্ব অস্বিকার করা মুর্খতা বৈ কিছু নয়। কুরআনে কারীমে আল্লাহর একাত্ববাদ সম্পর্কিত সকল আয়াতই তাওহীদ বিষয়ক। হুবহু শব্দ না থাকুক।
মাযহাব কোনটি অনুসরণ করবো?
এর উত্তরও আমরা পবিত্র কুরআনে পরিস্কার ভাষায় দেখতে পাই-
ইরশাদ হচ্ছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ [٤:٥٩]
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর,নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং “তোমাদের মধ্যে” যারা জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ তাদের। [সূরা নিসা-৫৯]
উক্ত আয়াতে খেয়াল করুন। আল্লাহ তাআলা ও রাসূল সাঃ এর অনুসরণের নির্দেশের পরেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে “উলিল আমর” তথা বিচারক বা জ্ঞানী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের অনুসরণ করতে।
আল্লাহ ও নবীজী সাঃ এর বিধান বিশেষজ্ঞ জ্ঞানীদের বলা হয় মুজতাহিদ।
এখন প্রশ্ন হল, সারা বিশ্বে অসংখ্য মুজতাহিদ থাকতে পারে। ব্যক্তি কোন মুজতাহিদের অনুসরণ করবে?
আল্লাহ তাআলা এ প্রশ্নের সমাধান জানিয়ে দিয়েছেন আয়াতের “মিনকুম” শব্দ দ্বারা। এর অর্থ হল, তোমাদের মাঝের” তথা তোমাদের মাঝে, তোমাদের সমাজের, তোমাদের এলাকার যিনি মুজতাহিদ হবেন, তোমরা তার অনুসরণ করো। দূরের মুজতাহিদের অনুসরণের কথা বলেননি। অর্থাৎ যার থেকে ফায়দা হাসিল করা সম্ভব নয়, তাদের পিছনে ছুটতে বলা হয়নি। বরং যে মুজতাহিদের ইজতিহাদ পাওয়া যায়, সহজলভ্য, যে মুজতাহিদ নিজেদের এলাকায় থাকেন, সেই মুজতাহিদের অনুসরণ করার কথা পবিত্র কুরআনে পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়ে আমাদের জন্য বিষয়টি সহজ করে দিয়েছেন।
এবার আমরা দেখি এ উপমহাদেশে কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ অনুপাতে ইসলাম আসার পর থেকে ইসলামের যাবতীয় মাসায়েল এসেছে?
নিশ্চয় হানাফী মাযহাবের।
যেদিন থেকে এ উপমহাদেশে ইসলাম নামক জান্নাতী ধর্ম প্রবেশ করেছে, সেদিন ইসলামের সাথে সাথে ইসলামের যেসব বিধানাবলী প্রবেশ করেছে, তা সবই হানাফী মাযহাবের ইমামের ইজতিহাদ অনুপাতে সুবিন্যস্ত কুরআন ও হাদীসের বিধানাবলী।
এ কারণে এ উপমহাদেশের মানুষ মাসায়েল নামায, রোযা, অজু, গোসল ইত্যাদি যাবতীয় মাসায়েলের সুনির্দিষ্ট মাসায়েলগুলো, ওয়াজিব, সুন্নাত, ভঙ্গের কারণ, মাকরূহাত ইত্যাদি সবই হানাফী মাযহাব অনুপাতেই জেনে আমল করে আসছে। এ উপমহাদেশে এ বিষয়ক অসংখ্য গবেষণাগার মাদরাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কুরআন ও হাদীসের সহীহ ব্যাখ্যা নির্ভর এ মাযহাব অনুসারী অসংখ্য শাইখুল হাদীস, মুহাদ্দিস, মুফতী, মুফাককিরে ইসলাম জন্ম নিয়েছেন। তারা আরো সুবিন্যস্তভাবে এ মাসায়েলগুলোকে মানুষর সামনে তুলে ধরেছেন। এখন একজন মানুষ ইচ্ছে করলেই দ্বীনের যেকোন মাসআলা সুনির্দিষ্ট হুকুমসহকারে আলেম উলামাদের কাছ থেকে জেনে আমল করতে পারে।
কিন্তু এ উপমহাদেশের কোথাও শাফেয়ী, হাম্বলী, মালেকী মাযহাবের মাদরাসা দেখা যায় না। দেখা যায় না, এসব মাযহাব বিশেষজ্ঞ শাইখুল হাদীস, মুফতীয়ানে কেরাম। দেখা যায় না ব্যাপক আকারে তাদের কোন কিতাব।
ফলে এ উপমহাদেশে কোন ব্যক্তি অন্য মাযহাব মানতে চাইলে, তার পক্ষে সেই মাযহাব অনুপাতে সকল মাসায়েল জানতে পারা সম্ভব নয়। কারণ না বিশেষজ্ঞ খুঁজে পাবে। না পর্যাপ্ত কিতাব।
এ কারণে সহজ সমাধান হল, যে এলাকায় যে মুজতাহিদের ইজতিহাদ অনুপাতে কুরআন ও হাদীসের মাসায়েল ইসলাম আসার পর থেকে আমলী সূত্রে এসেছে, উক্ত এলাকায় উক্ত মাযহাব অনুপাতেই ইসলামী শরীয়ত পালন করবে। তাহলে আর কোন ফিতনা ও বিভ্রান্তি থাকবে না।
এদিকেই আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়ে সুরা নিসার ৫৯ নাম্বার আয়াতে বলেছেন “মিনকুম” তথা তোমাদের মাঝের বিশেষজ্ঞকে অনুসরণ কর।
তাই উপমহাদেশে হানাফী মাযহাব, শ্রীলংকাতে শাফেয়ী মাযহাব, ও মক্কায় হাম্বলী ও মদীনার লোকেরা মালেকী মাযহাব অনুসরণ করে থাকে। এভাবে যে এলাকায় যে মাযহাবের অনুসারীরা দ্বীন এনেছে ও কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক মাযহাবের আমল জারী হয়েছে, উক্ত এলাকায় সেই মাযহাবই মানবে। তাহলে আর কোন বিভ্রান্তি থাকবে না।
আর প্রশ্নকারী যেহেতু বাংলাদেশের অধিবাসী। তাই তিনি হানাফী মাযহাবের অনুসরণ করবেন। এটাই পবিত্র কুরআনের আয়াতের দাবী।
মাযহাবের ইমামদের লিখিত গ্রন্থাবলী
মাযহাবের ইমামগণ কুরআন ও হাদীসের মাসায়েলগুলো গবেষণা করে যা বের করেছেন, তা পরবর্তীতে তাদের ছাত্ররা কিতাব আকারে সংকলিত করেছেন। যেসবকে ইসলামী ফিক্বহ বলা হয়।
আর হাদীস নবীর হবার পরও সংকলক ইমাম বুখারী মুসলিম হবার কারণে যেমন সংকলনকারীর দিকে নিসবত করে বুখারীর হাদীস, মুসলিমের হাদীস বলা হয়, তেমনি ফিক্বহে ইসলামী সংকলকদের নামেও উক্ত ফিক্বহগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। যেমন হানাফী ফিক্বহ, শাফেয়ী ফিক্বহ, হাম্বলী ফিক্বহ, মালেকী ফিক্বহ। যা ইসলামী লাইব্রেরীগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলেই আপনার দৃষ্টিগোচর হবে।
মক্কা মদীনার বড় লাইব্রেরীগুলোর দিকে তাকালেই আপনার চোখে মাযহাবের ইমামদের সংকলিত ফিক্বহে ইসলামীর অসংখ্য কিতাব নজরে আসবে।
অন্ধ অনুসরণ!
প্রথমে অন্ধ অনুসরণের অর্থ বুঝে নিন।
অন্ধ ব্যক্তি আরেক অন্ধের পিছনে পিছনে চলার নাম হল অন্ধ অনুসরণ। কিন্তু অন্ধ কোন চক্ষুষমানের পিছু পিছু, তার হাত ধরে চলার নাম কিন্তু অন্ধ অনুসরণ নয়। একে বলা হবে চক্ষুষমানের অনুসরণ।
আপনি যদি বলেন, মুজতাহিদ তথা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির অনুসরণ করে দ্বীন মানাও অন্ধ অনুসরণ। তাহলে বলবোঃ
আপনি মুজতাহিদ না হলে, মুখে যতই বলেন, কারো অনুসরণ করবেন না, কিন্তু আপনি কারো না কারো অন্ধ অনুসরণ না করে দ্বীন মানতেই পারবেন না।
সহীহ, জঈফ, মুনকার, মুদাল্লাস, হাসান ইত্যাদি পরিভাষা আপনি মুহাদ্দিসদের অন্ধ অনুসরণ ছাড়া ব্যবহার করতে পারবেন না। কারণ এসব পরিভাষা কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই।
কোন রাবীকে সহীহ বলা, বা জঈফ বলা, হাদীসকে সহীহ বা জঈফ বলা, ইত্যাদি আপনি মুহাদ্দিসদের মন্তব্যের অন্ধ অনুসরণ ছাড়া বলতেই পারবেন না।
দেখা যাবে এক মুহাদ্দিস তার জন্ম নেবার চারশত বছর আগের রাবীর ক্ষেত্রে মন্তব্য করছেন। যা বুঝা যায়, তিনি উক্ত রাবীকে দেখার প্রশ্নই আসে না। তবু আপনার উক্ত মুহাদ্দিসের কথাই মানতে হয় অন্ধভাবে।
যেমন ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী অষ্টম শতাব্দীর লোক। কিন্তু তিনি দ্বিতীয় তৃতীয় শতকের রাবীদের ব্যাপারেও জরাহ করেছেন। তার এসব জরাহ আপনি কিসের ভিত্তিতে মানবেন? নিশ্চয় আপনাকে এ বিষয়ে অন্ধ তাকলীদই করতে হবে।
সুতরাং কারো অন্ধ অনুসরণ করবেন না এটি খুবই চটকদার কথা হলেও বাস্তবে অন্তসারশূণ্য একটি কথা।
তাই এসব পন্ডিতী করে শুধু আপনি সময় বরবাদ করবেন। নিজের মনে পেরেশানী তৈরী করবেন। দ্বীনী মাসায়েল বিষয়ে সন্দেহ হতে হতে [আল্লাহ না করুন] এক সময় পুরো দ্বীনের উপরই আপনার সন্দেহ তৈরীর মত ভয়াবহ অবস্থাও তৈরী হয়ে যেতে পারে।তাই নিজের অজ্ঞতা সত্বেও কুরআন ও হাদীসের বিধানাবলী বিশেষজ্ঞ সাজার এ ভয়াবহ খেল বন্ধ করুন।
বাংলাদেশে প্রচলিত কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক সংকলিত হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে মনের প্রশান্তির সাথে ইবাদত করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সহীহ দ্বীনের উপর চলার তৌফিক দান করুন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন